সুখ কি আসলেই সোনার হরিণ?

আমাদের লোককথায় সোনার হরিণের গল্পটি সবার জানা।

এক মায়াবী, অসম্ভব সুন্দর হরিণ, যার পেছনে ছুটতে গিয়ে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। সে কাছে এসেও ধরা দেয় না, কেবলই মরিচীকার মতো দূর থেকে হাতছানি দিয়ে যায়। আজকের দিনে আমাদের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, ‘সুখ’ নামক অনুভূতিটাও যেন ঠিক ওই সোনার হরিণের মতোই এক মায়াবী অস্তিত্ব।

আমরা সবাই তার পেছনে ছুটছি—অবিরাম, ক্লান্তিহীন, কিন্তু সে কি আদৌ ধরা দেয়?

ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, সুখ হলো জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর এই সুখকে আমরা বেঁধে ফেলি বিভিন্ন শর্তের নিগড়ে।

আমরা ভাবি, পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই সুখী হব। সেই ধাপ পেরোলে মনে হয়, স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই বুঝি সুখের দেখা মিলবে। তারপর আসে ভালো চাকরি, গাড়ী, বাড়ি, বিয়ে—একটার পর একটা শর্ত আমরা আরোপ করতে থাকি।

আমাদের পুরো জীবনটাই যেন এক অন্তহীন অপেক্ষার তালিকা, যেখানে সুখ সবসময় ভবিষ্যতের কোনো অর্জনের ওপর নির্ভরশীল। সে কখনোই বর্তমানে থাকে না, তার বাস যেন সবসময়ই পরবর্তী স্টেশনে।

কিন্তু যখন আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত স্টেশনে পৌঁছাই, তখন কী হয়? যে পদোন্নতির জন্য রাতের পর রাত জেগেছি, তা পাওয়ার পর আনন্দটা কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হয় না।

যে বাড়িটিকে জীবনের পরম পাওয়া মনে করেছিলাম, মাস ঘুরতেই তার দেয়ালের রঙ ফিকে লাগতে শুরু করে। আমরা যাকেই সুখ ভেবে তাড়া করি, তাকে অর্জন করার পর উপলব্ধি করি—এ তো আসল সুখ নয়!

আসল হরিণটা হয়তো আরও কিছুটা দূরে। আর এভাবেই নতুন এক লক্ষ্যের পেছনে আমাদের নতুন দৌড় শুরু হয়।

সমস্যাটা হলো, আমরা সুখকে একটি বস্তু বা গন্তব্য ভেবে ভুল করি। আমরা ভাবি, সুখ এমন কিছু যা অর্জন করা যায়, অধিকার করা যায় এবং চিরকালের জন্য নিজের কাছে রেখে দেওয়া যায়। কিন্তু সুখ কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত।

কোনো এক বর্ষার বিকেলে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে চা পান করার মুহূর্তটাও সুখ। অনেক দিন পর কোনো প্রিয় বন্ধুর সাথে মন খুলে কথা বলার মুহূর্তটাও সুখ। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় খালি পায়ে ঘাসের ওপর হাঁটার অনুভূতিও সুখ।

সুখ আসলে কোনো সোনার হরিণ নয়, যাকে বহু কষ্টে শিকার করতে হবে।

সুখ হলো হাজারো ছোট ছোট রঙিন প্রজাপতির মতো, যা আমাদের চারপাশেই উড়ছে। আমরা যদি হরিণের পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করে একটু স্থির হয়ে বসি, তবে হয়তো দেখব, কোনো এক প্রজাপতি নিজেই উড়ে এসে আমাদের কাঁধে বসেছে।

আমরা বড় কোনো প্রাপ্তির আশায় এত মগ্ন থাকি যে, জীবনের এই ছোট ছোট আনন্দগুলোকে অনুভব করার ফুরসতই পাই না।

তাছাড়া, সুখের ধারণাটাও কি আমাদের নিজের? নাকি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া?

দামী গাড়ী, বিলাসবহুল জীবন—এগুলো কি সত্যিই আমাদের সুখী করে, নাকি এগুলো কেবলই সমাজের চোখে ‘সুখী’ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার উপায়? অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অন্যের সংজ্ঞায় সুখী হতে গিয়ে নিজের মনের সত্যিকারের চাওয়াটাকেই ভুলে যাই।

দিনশেষে, সুখ যদি সোনার হরিণও হয়, তবে সেই হরিণের পেছনে ছোটাছুটি করাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় বোকামি।

কারণ সেই মায়া হরিণ আমাদের কেবলই ক্লান্ত করে, পৌঁছে দেয় এক শূন্যতার রাজ্যে। বরং বুদ্ধিমানের কাজ হলো, যে অরণ্যে আমরা আছি, তার সৌন্দর্য উপভোগ করা।

পথের ধারের নাম না জানা ফুল, গাছের ছায়া, পাখির ডাক—এগুলোর মধ্যে যে নির্মল আনন্দ লুকিয়ে আছে, তা আবিষ্কার করা।

সুখকে তাড়া করে নয়, বরং আলিঙ্গন করে পেতে হয়। যখন আমরা ভবিষ্যতের শর্তের জাল থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান মুহূর্তকে বাঁচতে শিখব, তখন হয়তো উপলব্ধি করব—সোনার হরিণ বলে কিছু নেই।

যা আছে, তা হলো আমাদের ভেতরের সন্তুষ্টি আর এই জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল সুখের সন্ধান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *